ছবি: ফাইল ছবি
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগে থেকেই তেহরান কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, তবে যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে ইরানের পাল্টা আঘাতের ধরন ও তীব্রতা পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের অনেক হিসাবই পাল্টে দিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য এবং তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন ব্যবহারের সমন্বয়ে ইরান এমন এক যুদ্ধকৌশল গ্রহণ করেছে যা মোকাবিলা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক জোটকে। সংঘাতের শুরুতেই ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়, যার ফলে এই রুট দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, ইরানের প্রতিক্রিয়া তাদের পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও কৌশলগত। বিশ্লেষকদের মতে, বিশাল সামরিক বাজেট না থাকলেও ইরান তথাকথিত ‘অসম যুদ্ধ’ বা অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার কৌশল ব্যবহার করে কম সম্পদে বেশি ফল অর্জনের চেষ্টা করছে। ইরান বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবি, স্থানীয় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি ব্যবহার করে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সেনা চলাচলের ওপর নজর রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভৌগোলিক নৈকট্যের সুবিধা নিয়ে তারা স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করছে, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার আগেই আঘাত হানে। বিশেষ করে ‘শাহেদ’ সিরিজের ধীরগতির ছোট ড্রোনগুলো অনেক সময় রাডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হচ্ছে, কারণ এগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব কাছ দিয়ে উড়ে এবং আকারে ছোট হওয়ায় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করা হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হেনেছে এসব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ ও স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী জর্ডান ও কাতারে মার্কিন রাডার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র আক্রান্ত হয়েছে এবং কুয়েতের একটি বন্দরে হামলায় কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে আঞ্চলিক সংঘাত, বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে ইরান তাদের কৌশল আরও উন্নত করেছে। একই লক্ষ্যবস্তুতে একসঙ্গে অনেকগুলো ড্রোন পাঠিয়ে আক্রমণ করার ‘সোয়ার্ম অ্যাটাক’ কৌশলও তারা ব্যবহার করছে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে দেয়। পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে, যা এই হামলাগুলোকে আরও নিখুঁত করে তুলছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্বও স্বীকার করছে যে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের পরিকল্পনা বারবার পরিবর্তন করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে যে শুধু বিশাল সামরিক শক্তিই নয়, বরং সঠিক গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তির সৃজনশীল ব্যবহার এবং নতুন ধরনের কৌশলই আধুনিক যুদ্ধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
reporter

